ননিতা

ননিতা। বয়স ১৯। অপরূপ সুন্দরী মেয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার ভূতত্বে ভর্তি হয়েছে। পড়াশুনায় ব্যস্ত। কোনো অবসর নেই বললেই চলে। কবিতার বই পড়ে ও গান শুনে অবসরটা কাটে। পড়ন্ত বিকালে ছাদে যাওয়াটা ননিতার একটা নেশা।
এই ফাঁকে আমার পরিচয়টা দিই। আমি অমিও। বয়স ৩৫। গম্ভীর প্রকৃতির। বৃষ্টির দিনে খালি পায়ে রাস্তায় কিংবা ছাদে হাটাহাটি করতে ভালবাসি। বৃষ্টিবিলাষ আমার রক্তে। লেখালেখি আমার নেশা
কিছুদিন ধরেই আকাশে নিম্নচাপ। মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হচ্ছে। হালকা বাতাস।
কয়েকদিন আগের একটা অপরাধবোধ আমার মধ্যে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। আমার বাসা ১১ তলা ভবন। লিফটের ১০ এ থাকে বন্ধু প্রিতম। আমি থাকি দোতলায়। কয়েকদিন হলো; প্রিতম আমেরিকা থেকে এসেছে। ওর সাথে দেখা করার জন্য লিফটে উঠে দেখি- ননিতা। ও ছাদে যাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ফাঁকে ভুলেই গিয়েছি যে; আমি লিফটের কোনো বাটন চাপি নি। ননিতা চেয়ে ছিলো আমার দিকে। সে চাহনিতে একটা মায়া ছিলো। নীল রং এর জামা আর নীল রং এর টিপে অপরূপ সুন্দর লাগছিলো। কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলাম। ভুলেই গিয়েছি ইতোমধ্যে যে প্রিতমের বাসায় যাচ্ছিলাম । 
ছাদে চলে এসেছি দুজনেই। আবহাওয়া বেশ খারাপ। মনে হচ্ছে কয়েক মিনিটের মধ্যে বৃষ্টি শুরু হবে। মাঝেমধ্যে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। দমকা হাওয়া বইছে। বৃষ্টির অপেক্ষায় মনটা ছটফট করছিলো। বৃষ্টিও এলো কয়েক মিনিটের মধ্যেই। তুমুল বৃষ্টি। ছাদের উপর কনক্রিটের ছাতা আছে। সেখানে আশ্রয় নিলো ননিতা। আর আমি বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। সাদা পাঞ্জাবী আমার শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে।বৃষ্টির সাথে আমার সখ্যতা বেশ প্রবল। আষাঢ়ে বৃষ্টির ফোঁটার সাথে প্রতিনিয়ত সাক্ষাত হয় আমার।ছাদে শুয়ে পড়েছি এর মধ্যে। চোখ বন্ধ করে আছি আকাশের দিকে মুখ করে। গভীর বৃষ্টিবিলাসে ছেয়ে গেছে সমস্ত শরীর। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি চোখের পাতার উপর পড়ছে। অদ্ভূত ভাললাগায় ডুবে গেছি। হঠাৎ চোখের উপর কারও হাত। তবুও চোখ খুলি নি। তারপর কান্নার শব্দে চোখ খুলেই দেখি ননিতা। ফুঁপিয়ে কাঁদছেততক্ষণে বুঝলাম যে ও ভয় পেয়েছে।
আমি: তুমি কাঁদছো কেনো?
ননিতা: ভয় পেয়েছিলাম আপনাকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে।
আমি: ধুর পাগলী, তাই বলে এভাবে কাঁদতে হবে?
ননিতা: আপনি একটা পাগল। এভাবে কেউ বৃষ্টির মধ্যে শুয়ে থাকে?
আমি: আমি অন্য সবার মতো না। আমি কেবল আমিই।
ননিতা: আপনি একটা পাগল
আমি: ঠিক বলেছো। এখনও তুমি কাঁপছো কেনো?
ননিতা: আপনি কি আমার হাতটা একটু ছুঁয়ে দেবেন?
আমি তার হাত ধরেই বললাম: তুমি এতো সুন্দর কেনো?
সেদিন কিভাবে ফিরেছিলাম বাসায়; তা আর মনে নেই। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। সেদিন রাতে ননিতার বাসায় ইন্টারকমে ফোন দিয়ে জেনেছিলাম; ননিতার প্রচন্ড জ্বর। ১০৪ ডিগ্রী। ও নাকি তখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
এরপর বেশ কয়েকটা দিন জ্বরে ভুগে ভুগে গতকাল রাতে ননিতার আকস্মিক মৃত্যুর খবর পেলাম। এখনও ভাবতে পারছি না যে ননিতা আর নেই। কোন অভিমানে চলে গেলো সেই সমীকরণের হিসাব মেলাতে পারছি না। এখন মনে হচ্ছে-সেদিনের সেই বৃষ্টিই হয়তো ওর জীবনে কালো অন্ধকার নিয়ে এলো। ও হয়তো আজকেও ছাদে আসতো। নিজের জন্যও খারাপ লাগছে যে-হয়তো কোনোদিনই বৃষ্টিতে ভেজা হবে না আর। ননিতার সাথে সাথে আমার বৃষ্টিবিলাষকেও আজ থেকে হয়তো জলাঞ্জলী দিলাম। কিছু সুখময় স্মৃতি নিয়ে বাকি জীবনটা হয়তো কেটে যাবে। ওর জীবনের স্বপ্নগুলো কি ছিলো জানতে পারলে ভালো হতো। হয়তো কিছু পূরণে চেষ্টা করা যেতো। ওর জন্য খুব মায়া লাগে। এই মায়া আছে বলেই হয়তো জীবনের যে স্বাদ আছে সেটা আমরা উপলব্ধি করতে পারি। সহজেই যদি জীবনটা পার হয়ে যেতো তাহলে হয়তো জীবনে বেঁচে থাকার অর্থটা উপলব্ধি করতে পারতাম না।
মাঝে মাঝে ঘোরের মধ্যে ডুবে যাই। অনেকটাই আমার লেখার মতো…..
যাই হোক; ননিতা; তোমার জন্য আমার বাকি জীবনের অতৃপ্ত বৃষ্টিবিলাষকে উৎসর্গ করলাম। ভালো থেকো।